কীভাবে জ্বালানি তেল ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি ধ্বংসের মূল কারণ হয়ে উঠল

ভেনিজুয়েলা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত তেল মজুদের দেশ হওয়া সত্ত্বেও আজ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রতীকএই আপাত-বিরোধাভাস বোঝার জন্য আমাদের প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাসে ধাপে ধাপে ফিরে তাকাতে হবে।



ধাপ : তেলের আবিষ্কার অর্থনৈতিক মোহ (১৯২০১৯৪০)

১৯২০-এর দশকে ভেনিজুয়েলায় বিপুল পরিমাণ তেলের সন্ধান পাওয়া যায়। খুব দ্রুত দেশটি লাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারকে পরিণত হয়।

সমস্যার বীজ এখানেই রোপিত হয়

·                  কৃষি, শিল্প উৎপাদন খাত ধীরে ধীরে উপেক্ষিত হয়

·                  রাষ্ট্রের আয়ের প্রায় সবটাই তেলনির্ভর হয়ে পড়ে

·                  জনগণ সরকার উভয়ইসহজ অর্থেরওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে

এটি অর্থনীতির ভাষায় পরিচিত হয় Mono-Product Dependency হিসেবে।

 

ধাপ : “তেলের আশীর্বাদ” → “সম্পদের অভিশাপ” (১৯৫০১৯৭০)

তেলের উচ্চ দামের ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব পায়। এই অর্থ দিয়ে:

·                  ভর্তুকি

·                  সরকারি চাকরি

·                  আমদানি নির্ভর ভোগ্যপণ্য

·                  বড় কিন্তু অদক্ষ প্রকল্প চালু করা হয়।

কিন্তু এখানে দুটি মারাত্মক ভুল হয়:

দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হয়নি

রাষ্ট্রীয় ব্যয় কাঠামো তেলের দামের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে

এটি পরিচিত Resource Curse বা সম্পদের অভিশাপ নামে।

 

ধাপ : রাষ্ট্রীয়করণ রাজনৈতিক ব্যবহার (১৯৭৬)

১৯৭৬ সালে তেল শিল্প রাষ্ট্রীয়করণ করা হয় এবং PDVSA (রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি) গঠিত হয়।

প্রথমে এটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হলেও ধীরে ধীরে:

·                  রাজনৈতিক নিয়োগ

·                  দক্ষতার চেয়ে আনুগত্যকে গুরুত্ব

·                  স্বচ্ছতার অভাব

·                  PDVSA-কে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করে।

 

ধাপ : চাভেজ যুগতেল দিয়ে রাজনীতি (১৯৯৯২০১৩)

হুগো চাভেজ ক্ষমতায় এসে তেল আয়ের মাধ্যমে:

·                  ব্যাপক সামাজিক কর্মসূচি চালু করেন

·                  ভর্তুকি বিনামূল্যে সেবা বাড়ান

·                  জনগণের সমর্থন নিশ্চিত করেন

·                  কিন্তু একই সঙ্গে:

·                  বেসরকারি খাত দুর্বল হয়

·                  উৎপাদন হ্রাস পায়

·                  তেলের আয় সঞ্চয় বা বিনিয়োগ না হয়ে খরচে শেষ হয়

তেল এখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইঞ্জিন নয়, রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার জ্বালানি হয়ে ওঠে।

 

ধাপ : তেলের দাম পতন ধস (২০১৪)

২০১৪ সালে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

ফলাফল:

·                  সরকারের আয় হঠাৎ ভেঙে পড়ে

·                  আমদানিনির্ভর অর্থনীতি অচল হয়ে যায়

·                  খাদ্য ওষুধ সংকট শুরু হয়

·                  মুদ্রা ছাপিয়ে ঘাটতি পূরণভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি

এখানে তেল নির্ভরতা সরাসরি অর্থনৈতিক ধ্বংসে রূপ নেয়

 

ধাপ : নিষেধাজ্ঞা চূড়ান্ত পতন (২০১৭বর্তমান)

যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের নিষেধাজ্ঞা:

·                  তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করে

·                  বিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ করে

·                  PDVSA কার্যত অচল করে তোলে

যে অর্থনীতি ৯৫% তেল রপ্তানিনির্ভরতার জন্য এটি ছিল মরণাঘাত

 

তেল নিজে সমস্যা নয়, তেলের ওপর গড়া ভুল রাষ্ট্রব্যবস্থাই সমস্যা

ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে কারণ:

তেলকে একক ভিত্তি বানানো হয়েছিল

বৈচিত্র্য, উৎপাদন দক্ষতা গড়ে তোলা হয়নি

তেলকে উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো হয়েছিল

ফলে তেলযা দেশটিকে সমৃদ্ধ করতে পারতপরিণত হয় তার অর্থনৈতিক পতনের মূল চালিকাশক্তিতে

 


Search This Blog

Categories

SEARCH

About

Pages - Menu

SEARCH